fbpx

আজকের মুক্তিনাথ

আগে মুক্তিনাথ যেত হত হাঁটাপথে। এখন পাকা রাস্তা। গাড়ি চলে যাচ্ছে। লিখছেন হীরক নন্দী

 

লিখছেন হীরক নন্দী

বেনিতে পৌঁছোতে রাত হল। কাঠমান্ডু থেকে আসবার পথে একদম দাঁড়াইনি আমরা। ভাল হোটেল এখানে বেশি নেই, তবে পাহাড়দেশের নিরিখে চলে যায়। বেনিতে কম লোকেই রাত কাটায়। বেশিরভাগই পোখরা থেকে ভোরবেলা বার হয় গাড়ি নিয়ে বা বাস ধরে। দিনভর চলে সন্ধের মুখে মুখে বাস পৌঁছে দেয় মুক্তিনাথে। আগে মুক্তিনাথের পথে ট্রেক করেই অনেকে যেত। যেতে হত। এখন মুক্তিনাথ অবধি পাকা সড়ক। তবে সে পথ যে কতটা পাকা সে পরেরদিন রাস্তায় নামতেই টের পেলাম। বেনি থেকে তাতপানি কোনওক্রমে দুটো গাড়ি পাশ কাটাতে পারে এরকম একটা তরল কাদামাখা পথে সাঁতার কেটে গাড়ি যখন পায়ের তলায় ভালমতো মাটি পেল ঠিক তখনই প্রায় দু’ঘণ্টার জন্যে আটকে পড়লাম একটা সদ্য নামা ধসে। ধসের বাধা দূর হলে, আবার যাত্রা। কখনও কালিগণ্ডকী নদীর সহগমন, কখনোওবা নিছকই পাহাড়ি রাস্তা। একসময়ে পুরো পথটাই নেমে এল গণ্ডকীর চওড়া হয়ে ছড়িয়ে পড়া নদীখাতে। পথ বলতে তেমন কিছু নেই। অন্যান্য গাড়ির চাকার দাগ দেখে দেখে ছোটখাটো বোল্ডার গুঁড়িয়ে-মাড়িয়ে পথচলা। দুপুর পেরিয়ে এসে পড়লাম মারফায়। ভারী সুন্দর গ্রাম। মনে হয় যেন নদীর পাড়ে তুলে এনে কেউ বসিয়ে দিয়েছে। মারফা থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে জোমসোম। যারা পোখরা থেকে প্লেনে করে আসে তাদের এখানেই নামতে হয়। নেপালের সব থেকে বিপজ্জনক এয়ারপোর্টগুলোর একটা। সকাল ন’টা সাড়ে ন’টার পরে ওঠানামা করাই দুষ্কর। তাও নির্দিষ্ট কিছু মাসে। সব দিন চলতে পারেও না প্লেন। তবে প্লেন থেকে আকাশ পরিষ্কার থাকলে অন্নপূর্ণা রেঞ্জের যে ছবি দেখা যায়, তা নাকি জীবনে ভোলার নয়! আমাদের চোখে রেঞ্জ ভালভাবে ধরা দিল যখন জোমসোম ছাড়িয়ে নদীখাতে নেমে গাড়ি আবার পাহাড়ে উঠল। অপূর্ব ল্যান্ডস্কেপ। তিনদিকে রুখুসুখু পাহাড় আর ফিতের মতো বাঁধানো রাস্তা গড়িয়ে গেছে সোজা অন্নপূর্ণা রেঞ্জের দিকে। ডাইনে-বাঁয়ে পাহাড়গুলোর ঘষা-ঘষা ভিন্ন রঙের নানা ধাঁচের ভূত্বক। এই বন্ধুর বিচিত্রবর্ণ প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি ছোট হতে হতে গিয়ে মিলেছে এক প্রান্তবিন্দুতে, যেখান থেকে আকাশের অঢেল নীলকে আড়াল করে খাড়া উঠে গেছে সাদা বরফের রাজ্য। সম্মোহিতের মতো এগিয়ে গেলাম সেই পথে। আরো দু’-একটা ছোট ছোট গ্রাম ছাড়িয়ে রানিপাউয়া। মুক্তিনাথের ঠিক পায়ের কাছে ছোট্ট আর শেষ গ্রাম। রাতে থাকার ব্যবস্থা খুব ভাল না হলেও চলনসই। খাওয়ার ব্যবস্থা যথেষ্টই ভাল। স্থানীয় খাবার, চাউমিন, ফ্রায়েড রাইস তো মিলবেই, এছাড়া পাস্তা, পিৎজা, এমনকী অ্যাপ্‌ল স্ট্রুড্‌লও জুটবে। ছোট-বড় শালগ্রাম আর অন্যান্য নানা হস্তশিল্প সাজিয়ে বসা বেশকিছু দোকানঘর। গণ্ডকীনদীর আরও ওপরদিকের বা কাছাকাছি নদীখাতেও কুড়িয়ে পাওয়া যায় প্রচুর শালগ্রামশিলা। আসলে শিলীভূত প্রাণীর অবশেষ। মাটিতেও চাদর পেতে বসেও চলেছে বিকিকিনি আর খদ্দের ধরার চেষ্টা। গ্রাম থেকে পাহাড়ি পথে একটু ওপরে উঠে মুক্তিনাথের মন্দিরচত্বর। কেউবা এই পথটা ঘোড়ায় চড়ে ওঠেন, অশক্ত মুক্তিকামীরা ওঠেন লোকের কাঁধে চেপে ডুলিতে যা এখানে আদতে স্ট্রেচার। নেপালি ধাঁচে গড়া মাঝারি আকারের মন্দির। একপাশে সার বাঁধা ১০৮টা নালিমুখ থেকে জল ঝরে পড়ছে। লোকে পুণ্যসঞ্চয়ের জন্যে এই জলে স্নান করে তবে মুক্তিনাথের পুজো দেয়। সামনের কুণ্ডেও এই জলই ধরা আছে। সেখানেও স্নান করে কেউ কেউ। অধিকাংশ মানুষই মাথায় জল ছিটিয়ে কাজ সারে। ১২৩০০ ফিটে অবস্থিত মুক্তিনাথ পৃথিবীর সর্বোচ্চ মন্দিরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই একই চত্বরের অন্যপাশে একটু দূরে মাটি থেকে বেরিয়ে আসা অনির্বাণ অগ্নিশিখা ঘিরে বৌদ্ধমন্দির। মুক্তিনাথের বিষ্ণুমন্দিরের মতো জনপ্রিয় না হলেও তন্ত্র অনুসারে ওই প্রজ্বলন্ত শিখা শক্তির রূপ, শাস্ত্রোক্ত ৫১ শক্তিপীঠের একটি – ‘গণ্ডকী’। মুক্তিনাথের জন্যে দর্শনার্থীর ভিড় লেগেই থাকে। কেউ বা আসেন শুধু হিমালয়ের টানে। সাধারণের সাধ্যে অন্নপূর্ণা রেঞ্জের সান্নিধ্য পেতে এর থেকে ভাল জায়গা আর কী হতে পারে!

ছবি: লেখক

আরও পড়ুন: ডাব আর নারকেলের গুণ দেখলে অবাক হবেন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

You're currently offline