fbpx

ছুটি কাটাতে বালি দ্বীপে

ছুটি কাটাতে বালি দ্বীপে

 

মৌসুমী ঘোষ

ইন্দোনেশিয়ার একটা দ্বীপ বালি। সেখান থেকে বোটে করে প্রায় ঘন্টাখানেকের সফরে আমাদের কুটা (বালি দ্বীপের একটা শহর) ছেড়ে Nusa Lembongan যাওয়ার কথা। গতকাল রাতেই শুনেছিলাম সাই (আমাদের ড্রাইভার) আসবে না। বোট কোম্পানির থেকে লোক আসবে আমাদের নিয়ে যেতে। সকালে উঠে দেখি আকাশ মেঘে ঢাকা। টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে।এই অবস্থায় আমাদের উত্তাল সমুদ্র পার হতে হবে। জলে এমনিতেই ভয়। কিন্তু ওখানে যেতে হলে বোটই ভরসা। যাইহোক ঠিক সকাল সাড়ে সাতটায় আমাদের গাড়ি এল। আমরা পৌঁছালাম সনুর জেটিতে। কত লোকজন। তবে সবাই একদিকে নয়। কেউ নুসা পেনিডা, কেউ Lembongan। আমাদের একটা জায়গায় নিয়ে গিয়ে বসতে বলল।আমরা ওখানে কোন হোটেলে উঠব লিখে নিল। আমাদের হ্যান্ডব্যাগ ছাড়া বাকি জিনিসে ওরা ট্যাগ লাগিয়ে দিল।আমাদের গলাতেও ঝুলিয়ে দিল পরিচয় পত্র। যদি অন্য বোটে উঠে যাই, তাই হয়তো এই ব্যবস্থা। সারি সারি বড় বড় বোট লাগানো। মানে দড়ির সাহায্যে আটকানো।ঢেউয়ের তোড়ে একবার এদিক, একবার ওদিক করছে। সবাই হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে ঢেউ সামলে খালিপায়ে বোটে উঠছে। আমি একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। কী যে হবে! নদীতে নৌকা চড়া আর সমুদ্রে নৌকা চড়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত আমার কাছে। ধীরে ধীরে আমাদের বোটের ছাড়ার সময় হয়ে গেল। লাগেজ উঠেছে আগেই। এবার জয় মা বলে এগোলাম সমুদ্রের দিকে। জুতোও ওরা নিয়ে চলে গেল। অবশ্যই স্লিপার ধরনের জুতো পরবেন ট্রাভেলের সময়। বালি জল মেখে অনেক কষ্টে দু’তিনজনের সাহায্যে দু’বার স্লিপ খেয়ে উঠলাম। নীচে সারি সারি বসার জায়গা।জানালার ধারটা মেয়েকে দিয়ে বসলাম। অতনু একটু আগে বসল। লাইফ জ্যাকেট আছে কিন্তু পরতে বলল না।মনে হল, আবহাওয়া খারাপ বলে সমুদ্রের জল খুব লাফাচ্ছে। বৃষ্টি পড়ছে।জামাকাপড়ও প্রায় ভিজে গিয়েছে। বোট ছাড়ল। বেশ যাচ্ছি। হঠাৎ দেখলাম একটা ছেলে বাইরে থেকে জানলাগুলো বন্ধ করে দিল। কাচের জানালা। এমনিই সব দেখা যাবে। একটু পরেই মনে হল, আমরা মনে হয় সমুদ্রের ভেতর দিয়ে চলেছি। ঢেউয়ের ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে চলেছি। জলের তোড়ে ওইরকম মনে হচ্ছিল। দীর্ঘ ৪৫ মিনিট ওইভাবে বসে রইলাম। খুব ভয় লাগছিল।মাঝসমুদ্রে বিশাল বিশাল ঢেউ। আর তেমনি স্পিড, বোটের। ধীরে ধীরে স্পিড কমলো। আমরা দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম দ্বীপটিকে।এত সুন্দর লাগছিল যা ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে বোট থামল। আমরা এক এক করে নামলাম। নেমেই দেখি একজন দাঁড়িয়ে অতনুর নাম লেখা একটা পেপার নিয়ে।উফফ, নিশ্চিন্ত। চারিদিক খোলা (মাথা অবশ্য চাপা) গাড়িতে সারাদিন থাকতে হবে আজ। সে বলল, আগে হোটেল পৌঁছে লাগেজ রেখে তারপর ঘুরতে নিয়ে যাবে।হোটেল সমুদ্রের পাশেই। মেন রোড থেকে একটু হেঁটে আসতে হল। এসেই মনে হল, সমুদ্রের জলে পা-ডুবিয়ে চুপ করে বসে থাকি। আর কোথাও ঘুরতে যেতে ইচ্ছা করছে না। খুব খিদেও পেয়েছে আমার। তাড়াতাড়ি করে মেয়ে-বাবাতে মিলে ব্রেকফাস্ট অর্ডার করল।খেয়েদেয়ে সব লাগেজ রুমে রেখে বেরিয়ে পড়লাম।লোকালয় ছেড়ে হালকা ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চলল।খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলাম ইয়োলো ব্রিজের সামনে। ব্রিজটা পুরোপুরি হলুদ রঙের। ব্রিজটি দুটো আইল্যান্ডকে জুড়েছে। Nusa Lembongan আর Caningan… স্কুটার করে সবাই এদিক থেকে ওদিক যাতায়াত করছে। আমরা ব্রিজের মুখে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। তারপর ওখান থেকে গেলাম ড্রিম বিচ। খুব সুন্দর। পাশেই আর একটা জায়গায় গাড়ি থেকে নেমে ওয়াও বলা ছাড়া আর ভাষা ছিল না। ওখানে সমুদ্রের মধ্যে কেভ আছে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ ওর ভেতর দিয়ে যখন যাচ্ছে আঘাত লেগে বাষ্পের মতন বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।চোখের জলের সাথে তুলনা করে নাম Devils Tear..অনেকক্ষণ বসে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছিল। জল ওপর অবধি উঠে আসছিল ছিটকে। অসাধারণ! দেখার পর ডাব খেয়ে আবার গাড়িতে ফিরলাম। এবার আমাদের গাড়ি অনেক ওপরে গেল ঘুরতে ঘুরতে। এখান থেকে পুরো দ্বীপটা দারুণভাবেই দেখা যায়। এবার লাঞ্চের সময়।আমাদের গাড়ির প্যাকেজের মধ্যে দুটো আইল্যান্ডের লাঞ্চ ধরা আছে। দেখি কোথায় নিয়ে যায়। বেশ গ্রামের পথ ধরে কিছুটা জঙ্গলের পথ ধরে আমরা পৌঁছালাম ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের কাছে। তিন-চার রকম অপশন আছে। যা খুশি নিতে পারি। আমি নার্সি গোরেং নিলাম। সঙ্গে জ্য ফ্রাসোয়া এমবায়ের পাপড় ও দিল আমার আর মেয়েরটায়।কর্তা সাদা ভাত আর চিকেনের কি একটা বলল।যেতেই ওরা কোল্ড ড্রিংকস আর জলের বোতল দিল।কোল্ড ড্রিংক ইচ্ছামতো। মেয়ে নিজেরটা ওদের ফ্রিজেই রাখল। যাওয়ার সময় নিয়ে নেবে। দারুণ খেলাম। সঙ্গে ফলও দিয়েছিল খেতে। লাঞ্চ প্রায় শেষের পথে তখন থেকেই ড্রাইভার এসে বলল, ম্যানগ্রোভ ফরেস্টটাও প্যাকেজে আছে। দেখে নিন।বাঃ, দারুণ ব্যাপার। নৌকায় উঠলাম অনেক কসরত করে।জলের রং কুচকুচে কালো।আমি কোনওদিন এইভাবে ম্যানগ্রোভ ফরেস্টে যাইনি।খাড়ির ভেতর দিয়ে নৌকা চলল। চারিদিকে গভীর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কত নাম না-জানা গাছ। পাতা পড়লেও শোনা যাবে। সুন্দরভাবে ঘুরে মনটা ভরে গেল।। আজকের মতন ট্রিপ শেষ। আমার তো খুব ইচ্ছা করছিল তাড়াতাড়ি হোটেলে পৌঁছতে। সমুদ্রের হাওয়া গায়ে মেখে আজ ক্যান্ডেল নাইট ডিনার করব। সকাল থেকে আজ রেস্ট পাইনি।একটু ঘুমিয়ে নিলাম। অপূর্ব কাটল দিনটা এই মায়াবী দ্বীপে। সন্ধের পর হোটেলে লাইভ গান-বাজনা আছে।সমুদ্রের পারে শরীর হেলিয়ে দিয়ে সেটা উপভোগ করব বাকিদের সঙ্গে। একেই বলে ছুটি কাটাননো।

আরও পড়ুন:  চুনার দুর্গ: অবহেলার এক দুর্গ শহর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

You're currently offline