fbpx

দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী

দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী

 

নিজস্ব প্রতিনিধি: সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার, ৩১ মে, ১৮৫৫, জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা। শহরের বহু মানুষই চলেছেন দক্ষিণেশ্বর। ধনী, দরিদ্র, ভিখারি– সবাই। কারণ, সেদিন রানি রাসমণির স্বপ্নের মা ভবতারিণীর মন্দির প্রতিষ্ঠা দিবস। সেই উপলক্ষে মন্দির সেজেছে ঝাড়লণ্ঠনে। দক্ষিণেশ্বর থেকে বরানগর– রাস্তার দু’পাশে আলোর রোশনাই। কলকাতা-সহ আশপাশের কোনও মিষ্টির দোকানে কোনও মিষ্টিই আর অবশিষ্ট নেই। এমনকী বৈদ্যবাটি, ত্রিবেণীর মিষ্টির দোকানেরও ঝাঁপ বন্ধ হয়েছে। সব মিষ্টি চলে গেছে রানিমায়ের দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে। শোনা যায়, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে এসেছিল পাঁচশো মন মিষ্টি। মন্দিরে এসে কেউই সেদিন মিষ্টিমুখ না-করে ফেরেননি। রানি রাসমণি দানও করেছিলেন প্রচুর। অল্পবিস্তর সকলেই পেয়েছিলেন রানিমায়ের দান।
এসব কথা প্রকাশিতও হয়েছিল ১২৬২ বঙ্গাব্দের ২২ জ্যৈষ্ঠ তৎকালীন সোমপ্রকাশ-এ। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল– জানবাজার নিবাসিনী পুণ্যশীলা শ্রীমতী রাসমণি জ্যৈষ্ঠ পৌর্ণমাসী তিথিযোগে দক্ষিণেশ্বরে বিচিত্র নবরত্ন ও মন্দিরাদিতে দেবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন, ওই দিবসে তথায় প্রায় লক্ষ লোকের সমাগম হইয়াছিল, এই পুণ্যকর্ম উপলক্ষে রাণী রাসমণি অকাতরে অর্থব্যয় করিয়াছেন, প্রত্যেক শিবস্থাপনে রজতময় ষোড়শ ও অন্যান্য বিবিধ দ্রব্য পট্টবস্ত্র নগদ টাকা দিয়াছেন; তারামূর্তি স্থাপনোপলক্ষে যে যে অনুষ্ঠানের আবশ্যক তত্তাবৎ বাহুল্যরূপে আয়োজন হইয়াছিল।
এছাড়াও সোমপ্রকাশ লিখেছে– অনেক পূণ্যাত্মা ব্যক্তি অনেকানেক স্থানে দেবালয় করিয়াছেন বটে, কিন্তু এ প্রকার বৃহৎ নবরত্ন ও নাটমন্দির কেহ করেন নাই, জগদীশ্বর পুণ্যবতী রাণী রাসমণিকে যে প্রকার অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারিণী করিয়াছেন, সেই প্রকার মহৎ অন্তঃকরণও দিয়াছেন, তিনি স্বীয় অতুল ধনের সার্থকতা করিলেন, এই অবনীমণ্ডলে তাঁহার চিরকীর্তি সংস্থাপিত রহিল।
মা ভবতারিণীর মন্দির প্রতিষ্ঠার আট বছর আগে রানি রাসমণি চলেছিলেন কাশীর বিশ্বনাথ, অন্নপূর্ণা দর্শনে। নৌকায় যাওয়া হবে। গোটা চব্বিশ নৌকায় মাস ছয়েকের রসদ উঠল। সবকিছু তৈরি। শুধু রওনা দিতে বাকি। রাত্রিবেলা রানি রাসমণি স্বপ্নে দেখলেন মা তাঁকে বলছেন, কাশী যাচ্ছিস কেন? না, তোর কাশী যাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। গঙ্গার ধারে সুন্দর একটা জায়গা দেখে মন্দিরে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা কর, নিত্য পুজো কর, ভোগও দিবি নিত্য। আমি তোর তৈরি মূর্তির ভিতর আবির্ভূতা হয়ে পুজো আর ভোগ করব।
রানি রাসমণি কাশীযাত্রা স্থগিত করলেন। নৌকায় তোলা সমস্তকিছু গরিব মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হল। এমনকী কাশী যাওয়ার জন্য যে-খরচ ধরা হয়েছিল, সেই টাকাপয়সাও ভাগ করে দেওয়া হল গরিবদের মধ্যে। এরপর জমি খোঁজার পালা। বহু চেষ্টার পর জমি পাওয়া গেল দক্ষিণেশ্বরে। রানি রাসমণির ইচ্ছা ছিল গঙ্গার পশ্চিমকূলে মন্দির নির্মাণের। কেননা, গঙ্গার পশ্চিমকূল বারাণসী সমতুল। প্রয়োজন মতো এবং মন্দির প্রতিষ্ঠার অনুকূল জমি মিলল শেষমেশ দক্ষিণেশ্বরেই। শুরু হল মন্দির নির্মাণ। সময়টা ১৮৪৭। শেষ হল আট বছর পর ১৮৫৫। মন্দির নির্মাণ এবং প্রতিষ্ঠার বহু বাধাবিপত্তি এসেছিল কিন্তু রানি রাসমণি কিছুতেই দমে যাননি। যাইহোক, মন্দির প্রতিষ্ঠার পর মা ভবতারিণীর পজোর ভার অর্পিত হল রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ওপর। তিনি বছরখানেক পুজো করেছিলেন মায়ের। রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর মায়ের পুজোর ভার পেলেন রামকুমার-ভ্রাতা গদাধর চট্টোপাধ্যায়।
দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণীর মূর্তি গড়ার ভার পেয়েছিলেন নবীন ভাস্কর। তাঁর তৈরি প্রথম এবং দ্বিতীয় মূর্তি পছন্দ ছিল না রানি রাসমণির। তাই সেই দুই মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয় অন্যত্র। তার মধ্যে একটি হল বরানগরের প্রামাণিক ঘাট রোডের ব্রহ্মময়ী মা। যাঁকে ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব ডাকতেন মাসি বলে। তিনি প্রায়ই যেতেন সেখানে। ঠাকুর বলতেন মাসির বাড়ি চললুম।
গদাধর চট্টোপাধ্যায় পরবর্তী কালে ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ধর্মভাবনাকে চারিত করলেন। জোয়ার আনলেন ধর্মভাবনায়। তাঁর টানে সমাজের কতশত মানুষ এলেন দক্ষিণেশ্বরে। কলকাতার শিক্ষিত সমাজও উপেক্ষা করতে পারেননি। তাঁরাও এসেছিলেন ঠাকুরের কাছে। সন্তান আর মায়ের মধ্যে যেমন ভালবাসা, মান-অভিমানের সম্পর্ক থাকে তেমনই ছিল মা ভবতারিণী আর রামকৃষ্ণ দেবের মধ্যে। ঠাকুর বিশ্বাস করতেন মা ভবতারিণীকে। এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়েছিল মা ভবতারিণী আর ঠাকুরের সম্পর্ক। তিনি যখন মায়ের পুজোয় বসতেন তখন তাঁর বাহ্যজ্ঞান লোপ পেত। রামকৃষ্ণের পুজোয় মায়ের মূর্তি প্রাণ পেত। অনেকেই মনে করেন রানি রাসমণির মন্দির প্রতিষ্ঠা থেকে রামকৃষ্ণ দেবের পূজারি হিসেবে আসা সবটাই ছিল পূর্বনির্ধারিত। ভগবানের নির্দেশ। ঠাকুর মা ছাড়া আর কিছুই জানতেন না। মা ভবতারিণীও দেখা দিলেন রামকৃষ্ণ দেবকে। তিনি সেইসময় থাকতেন কুঠিবাড়িতে। কুঠিবাড়ির ঘরে বসে শুনছেন নূপুরধ্বনি। ঠাকুর বেরিয়ে এসে দেখে মা ভবতারিণী মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে গঙ্গা দেখছেন। একাধিকবার মা ভবতারিণী দর্শন দিয়েছিলেন ঠাকুরকে এ-কথা সকলেরই জানা। নতুন করে বলার কিছু নেই। মায়ের কত নাম মা জগদম্বা, মা জগদীশ্বরী, মা ভবতারিণী।
দক্ষিণেশ্বরে কত ঘটনা ছড়িয়ে আছে মা ভবতারিণী, ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব, সারদা মাকে ঘিরে। সেইসময়কার কত বড় বড় সাধক, মানুষ এসেছেন দক্ষিণেশ্বরে। কত কি দেখার আছে এখানে। মা ভবতারিণী ভীষণই জাগ্রত। সামান্য অর্থের বিনিময়ে কুপন সংগ্রহ করলে মায়ের ভোগ পাওয়া যায়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়মকানুন বদলেছে। মন্দিরে পুজো, আরতি, খোলা-বন্ধেও পরিবর্তন হয়েছে।

ছবি : গুগুল

আরও পড়ুন:   মন্দিরময় গ্রাম পাথরার ঐতিহ্যকে রক্ষা করেছেন ইয়াসিন পাঠান

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

You're currently offline