fbpx

এক ব্যাতিক্রমী শাসক লর্ড বেন্টিঙ্ক

আজ তাঁর জন্মদিবসে তাঁকে স্মরণ করা।

শ্যামল কর

ভারতে বৃটিশ শাসনকালে যে কয়েকজন মুষ্টিমেয় গভর্ণর জেনারেল কিছু ঊদার ও প্রগতিশীল সংস্কারের মাধ্যমে ভারতে ও ভারতীয়দের মনে আধুনিক চিন্তার বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন লর্ড উইলিয়াম হেনরী ক্যাভেন্ডিস বেন্টিঙ্ক ছিলেন তাদের অন্যতম, ইতিহাসের পাতায় যিনি লর্ড বেন্টিঙ্ক নামেই বেশি পরিচিত। ১৮২৮ সালে তাঁকে বাঙ্গলার গভর্ণর জেনারেল পদে নিয়োগ করা হয় তাঁকে, ১৮৩৩ সালের সনদ আইন দ্বারা পরে তাঁর পদবিকে ভারতের গভর্ণর জেনারেল হিসাবে পুনরাখ্যায়িত করা হয়।
আর এই ১৮২৮ থেকে ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত তাঁর কার্যকালের সময়ে প্রশাসন শান্তিপূর্ণ কার্যাবলির জন্য বিশেষ সম্মান অর্জন করেছিলো। বিচার ব্যবস্থার উন্নতির জন্য, ভ্রাম্যমান বিচারালয় বা অফিস আদালত গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সর্বপ্রথম তিনিই যোগ্য ভারতীয়দের সরকারি উচ্চ পদে বহাল করেছিলেন, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট,ডেপুটি কালেক্টর পদে নিয়োগ করে, একই সাথে তাদের এক্তিয়ার ও বেতন বৃদ্ধিও করেছিলেন। তবে এটা ঠিকই, ভারতীয়দের নিয়োগ করার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র উদার মনোভাব ছিল, এমনটাই নয়, অর্থ সাশ্রয় ছিল অন্যতম বিষয়, কারণ শ্বেতাঙ্গ কর্মচারি নিয়োগ ছিল তুলনামূলক ভাবে খরচ সাপেক্ষ। আদালতে ফারসি ভাষার বদলে আঞ্চলিক ভাষা ও উচ্চ আদালতে ইংরেজি প্রবর্তন হয় তাঁর আমলেই। সেই সময়েই ম্যাকলের সভাপতিত্বে কমিশন গঠন করে বিখ্যাত Indian penal code বা ‘ভারতীয় দন্ডবিধি’ আইন রচনা করা হয় প্রচলিত সমস্ত বিধিগুলিকে সংকলিত করে। যে অবৈধ জমিগুলিকে নিষ্কর দেখানো হতো, লর্ড বেন্টিঙ্ক সেই জমিগুলোর উপরে রাজস্ব নির্ধারণ করেছিলেন,তাতে কোম্পানির আয় বৃদ্ধি হলেও, কৃষকদের ওপর করের চাপ বৃদ্ধি পায় নি, বরং তারা উপকৃত হয়েছিলো। নতুন নতুন এলাকায় চাষের ব্যাবস্থা করে, উৎপাদন ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে কোম্পানির আর্থিক লাভ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষকরাও তাঁদের অভাব অনটনের জীবনে কিছুটা হলেও উন্নতি ঘটাতে পেরেছিলো। আর এই দেশে শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে বেন্টিঙ্কের অবদান অনস্বীকার্য। ১৮১৩ খৃষ্টাব্দের চার্টার আইন অনুসারে সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শিক্ষার জন্য সেসময়ে এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ করলে আধুনিক শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক বেন্টিঙ্ক সে আইন বলেই ঘোষণা করেন, সেই বরাদ্দকৃত টাকা ইংরেজি শিক্ষার জন্য ব্যয় করা হবে। এ বিষয়ে তুমুল বিতর্ক ও মতানৈক্য সৃষ্টি হলে টমাস ম্যাকলে, রাজা রামমোহন রায় সহ প্রগতিশীল ভারতবাসীদের সমর্থন এবং সহযোগিতায় ইংরেজি ভাষা ও আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।ভারতীয় ডাক্তারদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে ১৮৩৪ সালে মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন ও শিশুহত্যা নিবারণ করেন লর্ড বেন্টিঙ্ক। রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন, তার যৌক্তিকতা ও সারবত্তা অনুভব করে বাঙ্গলার গভর্ণর লর্ড বেন্টিঙ্ক আইন পাশে উদ্যোগী হয়েছিলেন এবং বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীতে সতীদাহ প্রথাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাতিল ঘোষণা করেছিলেন ৪ঠা ডিসেম্বর ১৮২৯ সালে।
উইলিয়াম ক্যাভেন্ডিস বেন্টিঙ্কের জন্ম ১৭৭৪ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের বাকিংহ্যামশায়ারে।তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম ক্যাভন্ডিস ও ডরোথি বেন্টিঙ্কের দ্বিতীয় সন্তান। ১৬ বছর বয়সে বৃটিশ রাজকীয় বাহিনীতে যোগদান করে শেষে কর্নেল পদে তাঁ পদোন্নতি হয়।১৮০৩ সালে তাঁকে ভারতে পাঠানো হয় গভর্ণর হিসাবে।কোম্পানির কাজের দেখভালের জন্য তাঁর ভারতে আগমন ঘটলেও, দার্শনিক জেরেমী বেন্থামের হিতবাদী দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত বেন্টিঙ্ক, অনেক সংস্কারমূলক কাজের মাধ্যমে ভারত তথা ভারতবাসীর উন্নতি ঘটিয়েছিলেন,যা ২০০ বছরের বৃটিশ রাজত্বে অবশ্যই ব্যাতিক্রমী।

ছবি : গুগুল
আরও পড়ুন:  কলকাতায় চলল মেট্রো

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

You're currently offline