fbpx

দু’জন ছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধু কিন্তু যখন নায়ক ছিলেন তাঁর ঠোঁটে একটিও গান গাননি কিশোরকুমার

দু'জন ছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধু কিন্তু যখন নায়ক ছিলেন তাঁর ঠোঁটে একটিও গান গাননি কিশোরকুমার

কমলেন্দু সরকার

শাম্মি কাপুর আর কিশোরকুমার দু’জনে ছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধু। যাকে বলে জিগরি দোস্ত। কিশোরকুমারের গান খুবই পছন্দ করতেন শাম্মি কাপুর। শাম্মির পছন্দের তালিকায় ছিল কিশোরের গাওয়া বহু গান। বিশেষ করে দু’টি গান ছিল সবচেয়ে বেশি পছন্দের। একটি ‘জুয়েল থিফ’ (১৯৬৭)-এর ‘এ দিল না হোতা বেচারা’ আর অন্যটি ‘আরাধনা’ (১৯৬৯)-র ‘মেরে সপনো কি রানি’। এক সাক্ষাৎকারে শাম্মি কাপুর বলেছিলেন, “আমি যখন নায়ক ছিলাম তখন কিশোরকুমার আমার লিপে একটিও গান করেনি। অথচ ষাটের দশকে কিশোর কত ভাল ভাল গেয়েছে। আমরা দু’জনে ভীষণ ভাল বন্ধু। রুমাকে আমি বহুদিন আগে থেকে চিনতাম। ওরা আমার বাবার (পৃথ্বীরাজ কাপুর) নাটকের সঙ্গে ছিল। পরে তো ওর সঙ্গে কিশোরের বিয়ে হল। কিশোর পরে মধুবালাকে বিয়ে করে। সেও আমার নায়িকা ছিল।” কিশোরকুমারের ঘনিষ্ঠজনের কাছে শুনেছি, “শাম্মি আংকলের জন্য তাঁর দুয়ার ছিল সবসময়ের জন্য উন্মুক্ত। শাম্মি আংকলের যখন-তখন যাওয়া-আসার অনুমতি ছিল।”
তাহলে কিশোরকুমার কেন গাইলেন না শাম্মি কাপুরের ঠোঁটে একটিও গান। শোনা যায়, মহম্মদ রফি ছিলেন শাম্মি কাপুরের ভীষণই পছন্দের। রফি-শাম্মি দু’জনের মধ্যে ছিল সুন্দর এক রসায়ন। শাম্মি কাপুরের লিপে বহু হিট গান দিয়েছিলেন মহম্মদ রফি। মহম্মদ রফির প্রতি কিশোরকুমারের ছিল প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। রফিরও ছিল কিশোরের প্রতি। তাই কিশোর কোনওদিন চাননি শাম্মির লিপে গান গাইতে। মহম্মদ রফি প্রয়াত হওয়ার পর শাম্মি কাপুরের লিপে কিশোরকুমার প্রথম গাইলেন সুভাষ ঘাইয়ের ছবি ‘বিধাতা’ (১৯৮২)-য় কল্যাণজি-আনন্দজির সুরে ‘সাত সহেলিয়া খড়ি খড়ি’। এই গানটির সময়সীমা ছিল ন’মিনিট একুশ সেকেন্ড।
শাম্মি কাপুর বলেছিলেন, “আমি আর কিশোর একসঙ্গে একটি ছবি করেছিলাম। এই ছবিতে কিশোর ছিল নায়ক আর আমি ভিলেন। ছবির নাম ‘মেম সাহিব।’ নায়িকা ছিলেন মীনা কুমারী। ‘মেম সাহিব’-এ কিশোরের চমৎকার একটা গান ছিল।” ‘মেম সাহিব’ ছবির পরিচালক ছিলেন আর সি তলওয়ার। সুরকার মদনমোহন।
মহম্মদ রফি ছাড়াও আরও দশজন গায়কের কণ্ঠে ঠোঁট নাড়িয়েছিলেন শাম্মি। শাম্মি কাপুর আত্মপ্রকাশ করেন পঞ্চাশের দশকের প্রায় গোড়ায়। ছবি পরিচালক মহেশ কল-এর ‘জীবন জ্যোতি’ (১৯৫৩)। এটি যেমন শাম্মির প্রথম ছবি ছিল তেমনই ছিল নায়িকা চাঁদ উসমানি-র। এ-বছর ছ’টি মুক্তি পেয়েছিল শাম্মি কাপুরের। ‘লায়লা মজনু’ (১৯৫৩) ছবিতে তালাত মামুদের গানে লিপ দেন শাম্মি। পরে ‘মেম সাহিব’ (১৯৫৬) ছবিতেও গান গেয়েছিলেন তালাত মামুদ।
ষাটের দশকে শাম্মি কাপুর হিন্দি ছবির প্রতিষ্ঠিত নায়ক। শাম্মি-রফি তখন জুটি। রফি ছাড়া পর্দায় লিপ দিতে নারাজ শাম্মি। ওই ষাটের দশকেই শাম্মি কাপুর লিপ দিচ্ছেন ‘সিঙ্গাপুর’ (১৯৬০), ‘ব্লাফমাস্টার’ (১৯৬৩) ছবিতে মুকেশের। পরিচালক শক্তি সামন্তের ‘সিঙ্গাপুর’ ছবির ‘ইয়ে শেহর বড়া আলবেলা’ গানটি তো ছিল সুপারহিট।
এর আগে পরিচালক নরেশ সেগলের ‘উজালা’ (১৯৫৯) ছবিতে শঙ্কর-জয়কিষাণের সুরে মান্না দের গাওয়া একাধিক গানে লিপ দেন শাম্মি কাপুর। তার মধ্যে মান্না-লতার গাওয়া ‘ছম ছম ছুমক ছুমক’ তো ছিল সেইসময়কার হিট গান। পরবর্তী কালে মান্না দের গাওয়া শাম্মি কাপুরের লিপে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল শক্তি সামন্তের ছবি ‘জানে অনজানে’ (১৯৭১) ‘ছম ছম বাজে রে পায়েলিয়া’। শঙ্কর-জয়কিষেণের সুরে মান্না দের গাওয়া এই গানটি আজও মানুষ শোনেন। এই ছবিতে কিশোরকুমার গেয়েছিলেন টাইটেল ট্র‍্যাক ‘জানে অনজানে লোগ মিলে’।
সুবীর সেন গেয়েছিলেন পরিচালক নরেশ সেগল-এর ‘বয়ফ্রেন্ড’ (১৯৬১) ছবিতে শঙ্কর-জয়কিষেণের সুরে ‘দেখো না যাও এ জানেমন’। গানটি শাম্মি কাপুরের ছিল খুব পছন্দের। এই গানের কারণে সুবীর সেনের সঙ্গে ভীষণ ভাল বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল শাম্মি কাপুরের। সুবীর সেন আমাকে একবার বলেছিলেন, “এরপর থেকে শাম্মি কলকাতায় এলেই আমাকে ফোন করত। সারাদিন টো টো করে ঘুরতাম দু’জনে। একবার হল কি শাম্মি আমার বাড়ি এসে হাজির। সেদিন ছিল শনি কী রবিবার। কলকাতায় রেস ছিল। শাম্মি বলল, ‘আজ কোথাও আর যাব না। রেসের মাঠে যাব। রেস খেলব। দু’জনে গেলাম। রেস খেললাম। সেদিন ভাগ্য আমাদের সঙ্গে ছিল না। আমি হারলাম প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা। আর শাম্মি হারল একাশি হাজার টাকা।”
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানেও লিপ দেন শাম্মি কাপুর। ছবি ‘ব্লাফমাস্টার’। হেমন্তকুমারের (উনি বলিউডে এই নামেই পরিচিত ছিলেন) কণ্ঠে দুঃখের গানটি ছিল ‘আয় দিল অব কহিঁ লে যা’। শাম্মি কাপুরের বগলদাবায় শতরঞ্চি বাঁধা বিছানাপত্তর আর হাতে সুটকেস। হেমন্তের গানে লিপ দিতে দিতে বেরিয়ে পড়েছেন আশ্রয়ের খোঁজে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ অদ্ভুতভাবে খাপ খেয়েছিল শাম্মির লিপে। আসলে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এত ভাল গেয়েছিলেন গানটি সিনেমাপ্রেমী দর্শক এবং শাম্মি কাপুর ফ্যানদের মনেই হয়নি হয়তো অন্য কোনও গায়কের গান। তবে এই ছবিতে অর্থাৎ ‘ব্লাফমাস্টার’-এ শাম্মি কাপুর এক গায়িকার গানে লিপ দিয়েছিলেন। অবাক লাগছে হয়তো। বলিউডের কতিপয় নায়ক লিপ দিয়েছেন কোনও গায়িকার গানে। ‘ব্লাফমাস্টার’-এ শামশাদ বেগমের গাওয়া গান ‘চলি চলি কলি কিসমত’ ঠোঁট নাড়িয়েছিলেন শাম্মি কাপুর। সঙ্গে উষা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে সায়রা বানু গাইছেন। মহিলার সাজে মন্দ লাগছিল না শাম্মিকে!
সত্তরের দশকে শাম্মি কাপুর চলে এসেছিলেন পার্শ্বচরিত্রে। সেইসময় মহেন্দ্র কাপুর (জমির,১৯৭৫), শৈলেন্দ্র সিং (পরবরিশ, ১৯৭৭), সুরেশ ওয়দকর (বিধাতা)-এর গানে লিপ দিয়েছিলেন শাম্মি কাপুর।
জানা যায়, শাম্মি কাপুর তাঁর ছবিতে গান নিয়ে ভীষণ খুঁতখুঁতে ছিলেন। তিনি ছবি করার সময় দেখে নিতেন ছবির সুরকার কে, গায়ক কে ইত্যাদি। যেমন, ‘তিসরি মঞ্জিল’ (১৯৬৬) করার সময় সুরকার হিসেবে রাহুল দেববর্মন-এর নাম দেখে বেঁকে বসেছিলেন। তাঁর পছন্দের সংগীত পরিচালক ছিলেন শঙ্কর-জয়কিষাণ। তখন ছবির পরিচালক বিজয় আনন্দ অনেক করে বোঝান শাম্মি কাপুরকে। তবুও রাহুলের সুর শুনে নাক সিটকেছিলেন শাম্মি। ছবি মুক্তি পাওয়ার পর সবটাই ইতিহাস হিন্দি ছবির গানের জগতে।

ছবি: গুগুল

আরও পড়ুন: চলে গেলেন আশির দশকে হিন্দি ছবির গানে যুগান্তকারী গায়ক এসপি বালসুব্রহ্মণ্যম

 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

You're currently offline