fbpx

ষাটের দশকে প্রেমের চিঠি চালাচালি হত ঘুড়িতে

ষাটের দশকে প্রেমের চিঠি চালাচালি হত ঘুড়িতে

 

নিজস্ব প্রতিনিধি: ‘ইতিহাস বলে রোমান্টিক প্রেমের উন্মেষ ইংল্যান্ডে নয়, ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে– ফ্রান্সে। ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে। এবং একালে নয়, সেই মধ্যযুগে, হাজার শতক থেকে তেরো চৌদ্দ শতকের মধ্যে। অঙ্কুর, গাছ, ফুল– সব ওই কয়শ’ বছরে। ফ্রান্স থেকে স্পেন, ইটালি, ইংল্যান্ড, জার্মানী। গোটা পশ্চিম ইউরোপ। মধ্যযুগের শেষে ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চল যেন এক বিশাল প্রেমের বাগিচা।’ এসব আমার কথা নয়, বলেছেন শ্রীপান্থ তাঁর ‘ভালবাসার জন্ম’ লেখাটিতে।
ভালবাসার জন্ম, ভালবাসার দৃঢ় বন্ধন পুরনো বাড়ির ছাদ। আর মাধ্যম ঘুড়ি। ষাটের দশকে উত্তম-সুচিত্রার দুরন্ত প্রেমের ছবি দেখে বহু বাঙালি যুবক-যুবতী নিজেদের বসিয়ে ফেলেছিলেন ওঁদের জায়গায়। সিনেমার মতো প্রেম এসেছিল নীরবে। কখনও কখনও সরবে। বিশ্বকর্মা, পৌষপার্বণ আর সরস্বতী পুজোয় ঘুড়ি উড়ত আকাশ ছেয়ে। এখনও ওড়ে। সেইসময় বাড়ির মহিলারাও ঘুড়ি ওড়াতে জানতেন। একটা সময় নির্ধারিত থাকত যখন ও-বাড়ির যুবক আর এ-বাড়ির যুবতীকে ছাদে দেখা যেত। সাধারণত ওইসময়ে বাড়ির লোকেরা ছাদে উঠতেন না। তখন সেই যুবক সযত্নে প্রেমপত্রটি ঘুড়ির লেজে সেঁটে আকাশে উড়িয়ে ঠিক ওই যুবতীর বাড়ির ছাদে গোঁত্তা মারতেন। যুবতীটিও সেই প্রেমপত্রটি নিয়ে তার প্রেমপত্রটি সেঁটে উড়িয়ে দিতেন। তারপর সেই প্রেমপত্র হাতে পড়ত প্রেমিকের। এভাবেই প্রেমপত্রের উত্তর-প্রত্যুত্তর চলত ঘুড়ির ওড়াউড়িতে। কখনও নির্জন দুপুরেও চলত ঘুড়িরপ্রেম। তাই বাড়ির ছাদগুলোই হয়ে উঠেছিল এক একটা প্রেমের বাগিচা।
গ্রিসের বিজ্ঞানী-দার্শনিক আর্চিটাস যখন ঘুড়ির উদ্ভাবন করেন তখন তিনি কী ভেবেছিলেন তাঁর ঘুড়িই হবে বাঙালি প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেমের মাধ্যম! শোনা যায়, খ্রিস্টপূর্ব চার শতকে তিনি ঘুড়ির পূর্বপুরুষকে বানিয়েছিলেন। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন পায়রা। আবার অনেকেরই মত, ২৮০০ বছর আগে চিনেই প্রথম ঘুড়ির প্রচলন। পরবর্তী সময়ে ঘুড়ি ছড়িয়ে পড়ল এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। ইউরোপে ঘুড়ি প্রচলন হয় ১৬০০ বছর আগে। ঘুড়ি ওড়ানোর ব্যাপারে দক্ষ চিন, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া। এইসব দেশে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন আছে।
সেকালে চিনে ঘুড়ির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হত বিস্ফোরক। উদ্দেশ্য শত্রু-জাহাজকে ঘায়েল করা। পুরনোকালে ঘুড়ি ব্যবহৃত হত সামরিক কাজে। নৌবাহিনীর গোলন্দাজেরা অনুশীলন করতেন ঘুড়ি উড়িয়ে তাঁদের নিশানা-লক্ষ্যের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঘুড়ির সঙ্গে এরিয়াল জুড়ে রেডিয়ো-সংকেত পাঠানো হত। অনেকসময় জাহাজের খোঁজ না-মিললে ঘুড়ি উড়িয়ে নিখোঁজ জাহাজের খবরাখবর নেওয়া হত। ঘুড়ির মাধ্যমে গুপ্তচরবৃত্তিও হত। প্লেন আবিষ্কারের বহু আগে ঘুড়ির সঙ্গে মানুষকে বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া হত। ঘুড়ির সঙ্গে উড়ে-যাওয়া মানুষটির কাজই ছিল শত্রুপক্ষের সমস্ত খবরাখবর নেওয়া।
ঘুড়ি উড়িয়ে শুধুমাত্র এসবই হত, তা নয়। গবেষণার কাজেও ঘুড়ি ব্যবহৃত হয়েছে। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ঘুড়ি উড়িয়ে দেখেছেন বজ্রপাতের পিছনে বিদ্যুতের ভূমিকা আছে। স্কটল্যান্ডের দুই বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার উইলসন এবং টমাস মেলভিন ঘুড়ির সঙ্গে থার্মোমিটার জুড়ে সেটি আকাশে উড়িয়ে পরীক্ষা করেছিলেন পৃথিবীর ওপরের স্তরের তাপমাত্রা।
ভারতে ঘুড়ি এসেছে অনেক পরে। মুঘল আমলে। মুঘলেরা মূলত ঘুড়ি ওড়াতেন বিনোদনের জন্য। তারপর দিল্লি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল অন্যান্য রাজ্যে। কলকাতা শহরে ঘুড়ি আসে অনেক পরে। মেটিয়াবুরুজে নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ আসবার পর ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন খুব বেশি বাড়ে। ঘুড়ি ওড়ানোর পাশাপাশি প্রচলন হয়েছিল বুলবুলির লড়াইয়েরও। এই দু’টিই কলকাতার বাবু কালচারের সঙ্গে মিশে যায়। কলকাতার বাবুরা ঘুড়ির লেজে টাকা সেঁটে আকাশে ওড়াতেন। সেই কাটা ঘুড়ি যিনি ধরতেন টাকাটাও তিনিই পকেটস্থ করতেন। আবার শোনা যায়, পড়তি বাবুরা নাকি নকল টাকা ঘুড়িতে সাঁটিয়ে ওড়াতেন।
একটা সময় বাঙালির ঘুড়ি ওড়ানো কালচারটিই শেষ হতে বসেছিল। এবারে করোনার কারণে আকাশ-ছেয়ে ঘুড়ি দেখা যাচ্ছিল লকডাউনের সময় থেকে। মানুষের ঘরে বসে থাকতে থাকতে এসেছিল একঘেয়েমি। তাই দুপুরের রোদের তেজ কাটিয়ে গৃহবন্দি মানুষ ঘুড়ি-লাটাই নিয়ে ছাদে উঠতেন বিকেলবেলা। ঘণ্টা দুই-আড়াই সময় কাটাতেন সেই পুরনো অভ্যাসে। অনেকেই ঘুড়ি ওড়ানোর মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন আনন্দ কিংবা মুক্তির স্বাদ। খুঁজে পেয়েছিলেন সেই কৈশোরের নস্ট্যালজিয়া।

ছবি: গুগল

আরও পড়ুন:  মাতাজি আসেন ভালুকের রূপ ধরে, ভক্তদের হাতে প্রসাদ খেয়ে চলে যান

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

You're currently offline