ফেরিওয়ালাগুলো সব গেল কোথায়

 

কমলেন্দু সরকার

সেসব বহু আগের কথা। অন্তত বছর পঞ্চাশ তো হবেই। কত কত ফেরিওয়ালা ঘুরত কলকাতা তো বটেই, মফসসলেও। এখন আর চোখে পড়ে না। রাজপথে, অলিগলিতে ফেরিওয়ালাদের সাক্ষাৎ সেই সত্তরের দশক থেকেই কমেছে। ঠা-ঠা গ্রীষ্মের দুপুরে কিংবা শীতের নরম রোদ্দুর গায়ে লাগিয়ে যখন বাসনওয়ালা হেঁকে যেত, ‘বাসন নেবে গো, বাসন। ভাল ভাল কাঁসার বাসন আছে।” দূরে এই ডাকের নেপথ্যে ভেসে আসত কা-কা ডাক। তার সঙ্গে মিশত ঘুঘুর ডাক। সবমিলিয়ে একটা মায়াবী পরিবেশ তৈরি হত মুহূর্তে! বিশেষ করে, গ্রীষ্মের দুপুরে।
ঘরের ভিতর। বাড়ির অনেক মহিলা খেয়েদেয়ে ভাতঘুম দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন, সেইসময় এমন ডাক! এমন ডাক কি উপেক্ষা করা যায়। না, করা উচিত। এঁটো বাসনটা তাড়াতাড়ি ধুয়ে-মুছে ছুট দিলেন খিড়কি কিংবা সদর দরজার দিকে। ডাক দিলেন, “অ্যাই বাসনওয়ালা।” ওই বাসনওয়ালা বাড়ির গিন্নিমার পূর্বপরিচিত। বলল, “ভাল আছেন তো মা?” থালার বদলে জামবাটি নেবেন গিন্নিমা। ওঁরা পুরনো বাসন নিয়ে নতুনও দিতেন। পছন্দ হল। বাসনওয়ালা বলল, “আর গোটা পঞ্চাশেক টাকা দেবেন গিন্নিমা। নইলে পোষাবে না।” গিন্নিমা বললেন, “রোববার এসো। একটা মাঝারি সাইজের গামলা এনো তো। সেদিনই টাকাটা নিয়ো।” সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়িয়ে চলে গেলেন বাসনওয়ালা। আগে আগে একটা কাঁসার থালায় ঢং ঢং করে বাজাতে বাজাতে চলেছে তার ছোট্ট শাগরেদ। সে হয়তো তার ছেলেই হবে।
ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে যেত শোনপাপড়ি, ঝুরিভাজা, হাওয়াই মিঠাই বিক্রেতা। টিনের চৌকো বাক্সে একদিকে থাকত জিলিপির মতো গোল গোল পাকানো ঝুরিভাজা। আর অন্যদিকে থরে থরে সাজানো শোনপাপড়ি আর গোলাপি রঙের ছোট ছোট বলের মতো হাওয়াই মিঠাই। টিনের বাক্সের বাইরে এলেই হাওয়ায় চুপসে যেত। একজন নিয়ে যেত তেল চকচকে বাঁশের ডগায় ময়দার মতো মাখানো মিষ্টি চটচটে জাতীয় কিছু একটা। সেটি দিয়ে লোকটি আবার হাতঘড়ি, সিলিং ফ্যান, মাছ, ব্যাং এসব করে দিত। স্কুলের সামনে বসত হজমিওলা। তার কাছে পাওয়া যেত টলগুলির মতো হজমিগুলি, কুল, বোম্বাই আমড়া আর কারেন্ট নুন। এসব আর দেখতে পাই না।
গরমকালে সন্ধে হলেই শোনা যেত ‘বেল ফুল’ আর ‘কুলফি বরফ’ হাঁক। মাটির হাঁড়ির ভিতর থেকে ছোট ছোট লম্বাটে খোল বার করে হাতের চেটোয় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শালপাতায় ঢেলে দিত কুলপি। দই খাওয়ার কাঠের চামচ দিয়ে কেটে কেটে খেত হত। আর বেলফুল বিক্রেতাটি যে-গলি বা রাস্তা দিয়ে যেত গন্ধে ভুরভুর করত।
দুপুরবেলা আর এক ধরনের ফেরিওয়ালা দেখা যেত। তারা সাইকেলের বেল ক্রিংক্রিং করে বাজাত আর বলত, “আলতা, সিঁদুর, বাস তেল, ফিতে, চুড়ি আছে।” বাড়ির বউ বা যুবতী মেয়েরা ছিল তার ক্রেতা। অনেক ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে আবার রঙ্গ-রসিকতাও হত। বাস তেল মানে ছিল গন্ধ তেল। লোকটির সাইকেলটিই ছিল পুরো একটা মনিহারির দোকান। অনেকে আবার বাঁশের ডগায় চওড়া একটা শক্ত মতন বোর্ড লাগিয়ে তার মধ্যে ফিতে, চিরুনি সব মিলিয়ে মহিলাদের ব্যবহৃত জিনিস বিক্রি করত। অনেকে মহিলাদের শাড়ি, জামা-কাপড় ইত্যাদি বিক্রি করত। পরবর্তী সময়ে দেখেছি পুরুষদের জামা-ট্রাইজারের কাটপিস বিক্রি করতে।
মাঝেমধ্যে একটা লোককে দেখতাম সে আবার “টেলিগ্রাম, টেলিগ্রাম” কখনও “নেতাজি বেরিয়ে পড়েছে” বলে চিল চিৎকার করে কাগজ ফিরি করত। একটাসময় বেশকিছু ট্যাবলয়েড সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হত। তারাই পাঠকের নজর কাড়বার জন্য “টেলিগ্রাম, টেলিগ্রাম” বলে চেঁচাত। তবে সেইসময় বড় কেউ মারা গেল নামীদামি দৈনিকগুলোও একপাতার সান্ধ্য বুলেটিন বার করত। বাল্যকালে দেখেছি।
মোল্লার চকের লালদই কাঁধে বাঁক নিয়ে বিক্রি করত অনেকেই। তারা সম্ভবত অনেক অনেক দূর দূর থেকে আসত। তারা আবার সন্দেশও আনত। সেগুলোর নাম ছিল আতা সন্দেশ। মিষ্টিওলা নারকেলের ছাপা সন্দেশ, চন্দ্রপুলি ইত্যাদি বিক্রি করত। তবে এদের দুর্গাপুজোর সময় বেশি দেখা যেত।
বাচ্চাদের জন্য ছিল বায়োস্কোপ। একটা চৌকো বড় সাইজের বাক্সের মধ্যে হাতে ঘুরিয়ে সিনেমা দেখানো হত। থাকত বড় বড় শহরের ছবি। হিন্দি সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ছবি। বাংলার শুধুমাত্র উত্তম-সুচিত্রা। আর ওপরে বাজত সেইসময়কার হিট হিন্দি ছবির গান কখনও কখনও বাংলা। রেকর্ডগুলো ছিল সেভেন্টিএইট আরপিএম।
আর কতকিছু যে ছিল, এখন অনেককিছুই স্মৃতির অতলে। এখন অনেক মল হয়েছে, ঝাঁ-চকচকে দোকান হয়েছে বটে কিন্তু সেই মজাটা আর নেই। সেই ডাক আর শোনা যায় না। এখন কাঁসার বাসনপত্র তো দেখাই যায় না। পুজোর বাসন বা গোপাল বিক্রি হয় কাঁসা-পেতলের দোকানে। কলকাতার মধ্যে আর একটা কলকাতা ছিল, মফসসলের ভিতর মফসসল সেসব এখন উধাও!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *