ড্রাগন বংশীয় নারীরা বাঁধন ভাঙতে আজ এককাট্টা

শান্তা শিকদার

পাহাড়ি গ্রাম চিয়াং মে। তবে সারা বিশ্বে এর পরিচিতি long neck women village. বাংলা করলে দাঁড়ায় দীর্ঘ গ্রীবার মহিলাদের গ্রাম। বিস্মিত হচ্ছেন এ আবার কী! এই গ্রামের মহিলা বাসিন্দাদের ছবি তোলার জন্য সারা বিশ্বের তাবড় আলোকচিত্রীরা ছুটছেন সেখানে। ভ্রমণপিয়াসীরাও একবার হলেও যান। এখানকার মহিলাদের একঝলক দেখলেই মনে হবে আরে মেয়েটির গলা কোথায় রে বাবা! মাথা আর শরীরের মাঝে যে শুধু পাকানো ধাতব রিং! কিংবা রিং না-থাকলে মনে হবে, মেয়েটির গলা এত লম্বা হল কীভাবে, এও কি সম্ভব! সবই সম্ভব। সেইজন্যেই মানুষ যান তাইল্যান্ডের ওই long neck women village.
চিয়াং মে’র স্থানীয় মহিলাদের মতো গ্রামটিরও একটি ইতিহাস আছে। এঁরা তাইল্যান্ডের আদিবাসিন্দা নয়। আদিবাসস্থান মায়ানমার। কায়েন সম্প্রদায়ের মানুষ। একসময় মায়ানমার সেনা-পুলিশের অত্যাচার থেকে বাঁচতে তাইল্যান্ডের উত্তরে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেয়। উদ্বাস্তু শিবিরে ক্রমে ক্রমে এই কায়েন সম্প্রদায়ের সংখ্যা বেড়ে যায়। তাই ওই সম্প্রদায়ের নাম অনুসারে কায়েন গ্রাম বলেই পরিচিতি পায়।
এবার আসা যাক, ওই গ্রামের মেয়েদের কথায়। ওদের লম্বা গলার ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, জন্ম থেকেই কায়েন নারীদের লম্বা গলা হয় না। এই লম্বা গলা পেতে তাদের অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়। এক-আধ বছর নয়, দীর্ঘ ২১ বছর। কায়েন সম্প্রদায়ের রীতি অনুসারে পরিবারে কন্যার জন্ম হলে, তার চার-পাঁচ বছর বয়স থেকেই গলায় সোনার প্যাঁচানো রিং পরিয়ে দেওয়া হয়। (বর্তমানে সোনার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবহৃত হয় ধাতব রিং) আর মেয়েটি বড় হতে থাকলে প্রতিবছর রিঙের প্যাঁচও বাড়তে থাকে। এভাবে একটার পর একটা রিং যোগ করা হয় ২১ বছর পর্যন্ত। রিংগুলো হাতেই পরানো হয় বলে এতে প্রচুর সময় ব্যয় হয় এবং অত্যন্ত দক্ষ কারিগরের প্রয়োজন হয়। একবার পরানোর পর সেগুলো বছরের পর বছর ধরে আর খোলা হয় না। কেবলমাত্র পুরনো রিং পাল্টে ফেলে আবার বড় আকৃতির নতুন রিং পরান হয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা গলায় ৫ কেজি ওজনের রিং পরে থাকেন!
খবরে জানা যায়, এই মহিলারা যখন কথা বলেন, তখন মনে হয় যেন তাঁরা কুয়োর ভিতর থেকে কথা বলছেন। যদিও এই রিং পরেই কায়ান মহিলারা প্রায় সব ধরনের কাজকর্মই করতে পারেন, করেনও। তাঁদের চলাফেরায় এটা কোনও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। শুধু মাথা ঝাঁকান, বেশি পরিমাণে খাবার খেতে অসুবিধা হয়। বিশ্বের বাকি মানুষের কাছে এটা অদ্ভুত ঠেকলেও কায়েন সম্প্রদায়ের কাছে কিন্তু গর্বের বিষয়। যাঁর গলা যত লম্বা, কায়েনদের কাছে তিনি ততই সুন্দরী, সৌভাগ্যবতী।
এই ভারী ধাতব রিং কায়ান মহিলাদের গলা লম্বা করে কিনা তা নিয়ে যদিও মতভেদ আছে। কায়ান মহিলাদের গলা এক্স-রে করে ডাক্তাররা দেখতে পান, দীর্ঘদিন ধরে রিং পরলেও তাদের গলার হাড়ের দৈর্ঘ্য বা হাড়গুলোর মধ্যবর্তী ব্যবধানের কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। বরং রিংগুলোর চাপে তাদের বুকের খাঁচা এবং কাঁধ কিছুটা নিচের দিকে বসে যাওয়ার কারণেই তাদের গলাকে লম্বা বলে মনে হয়।
গলা লম্বা করার এই সংস্কৃতি কায়ানদের মধ্যে কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে সঠিক কিছু জানা যায়নি। তবে, অনেকে বলেন, বংশপরম্পরায় এই ঐতিহ্য রক্ষা করার এক প্রবণতা এসেছে কায়ান সম্প্রদায়ের মধ্যে।
কায়ানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাঁরা ড্রাগনের বংশধর। তাঁরা মনে করেন, অতীতে কোনও একসময় এক নারী ড্রাগনের সঙ্গে স্বর্গীয় দূতের মিলনের ফলে তাঁদের বংশের আদিপুরুষের জন্ম। আর সেই লম্বা গলা বিশিষ্ট ড্রাগন মায়ের সম্মান রাখতে কায়ান মহিলাদের গলা লম্বা হওয়া প্রয়োজন। সেই ধারণা মাথায় রেখেই মধ্যে গলা লম্বা করার সংস্কৃতির প্রচলন হয়েছিল।
আবার অনেকেই বলেন, এই রিংগুলো পরার প্রচলন হয়েছিল আত্মরক্ষার জন্য। পুরুষরা শিকারে গেলে নারীরা শিশুদের নিয়ে একলা ঘরে থাকত। আর গ্রামে বাঘ হামলা চালিয়ে মেয়েদের গলা ধরে টেনে নিয়ে যেত। তখন নিজেদের রক্ষা করতেই গলা, হাত, পা, কোমর ইত্যাদি জায়গায় এই শক্ত রিং তাঁরা পরতেন। ক্রমে সেটা ঐতিহ্যে দাঁড়িয়ে যায়।
আবার একথাও প্রচলিত যে, প্রাচীনকালে গলায়, হাতে, পায়ে রিং পরিয়ে মেয়েদেরকে পুরুষদের নজর থেকে সরিয়ে রাখা হত। পরে সেটাই সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
কারণ, যাই হোক এটা সত্য কায়ান জাতির এই প্রথা শুধুমাত্র মেয়েদের জন্যই, পুরুষদের জন্য নয়।
কায়ান মহিলাদের অনেকেই আজ কায়ান সমাজের এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। পাশে পেয়েছেন কিছু সামাজিক সংগঠনকেও। প্রথা বা নিয়ম ভাঙার এই লড়াইতে আধুনিক কায়ান নারীরা কি জিততে পারবেন? এ-জিজ্ঞাস্য অনেকেরই। তবে, লোহার বেড়ির এই বাঁধন আলগা করতে কায়ান নারীরা আজ এককাট্টা।

ছবি: গুগুল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *