ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য

কমলেন্দু সরকার: ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে নাথা সিং বিস্তের নাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাববেন ইনি কে? এঁর নাম তো শুনিনি। না, ইনি কোনও মাতব্বর নন, খুবই সাধারণ এক মানুষ। কিন্তু তাঁর মাতব্বরি আমি দেখেছি গাড়োয়ালের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। অনেকেই চেনেন, জানেন, এই গ্রামটিকে। বিশেষ করে, যাঁরা মা অনসূয়া বা অত্রি মুনির আশ্রম ট্রেক করেছেন। কিংবা রুদ্রনাথ ট্রেক করে মা অনসূয়া হয়ে নেমেছেন।

গাড়োয়ালের এই প্রত্যন্ত গ্রাম মণ্ডলে ঘুরতে গিয়ে দীর্ঘদিন ভগতের লজে থাকার দরুন এই নাথা সিং বিস্ত-এর সঙ্গে আলাপ, পরিচয়, তাঁর বাড়ি যাওয়া। তিনি থাকতেন মণ্ডলে অমৃতগঙ্গার ধারে চমৎকার এক বাড়িতে। নাথা সিং বিস্তকে আমি যখন দেখেছি উনি তখন প্রায় নব্বুইয়ের কোঠায়।

নাথা সিং বিস্ত পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের চাকরি পেয়ে চলে এসেছিলেন কলকাতা শহরে। সেইসময় কিন্তু মণ্ডল থেকে ঋষীকেশ হেঁটে আসতে হত। বাস, গাড়ি কিছুই ছিল না। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের চাকরিতে হঠাৎই তিনি পোস্টিং পেলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের দেহরক্ষী হিসেবে। নাথা সিং বিস্তের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ও হয় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর। ক্রমশ তিনি আস্থাভাজন এবং প্রিয়জন হয়ে ওঠেন বিধানচন্দ্র রায়ের। একদিন নাথা সিং বিস্ত বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে গিয়ে বলেন, “স্যর, আমাকে কয়েকদিন ছুটি দেবেন বাড়ি যাব।” বিধানচন্দ্র রায় বলেন, “কয়েকদিন নয়, তুমি কয়েক মাস ছুটি নিয়ে বাড়িতে থাকো। ভাল খাবার খাও। দুধ, ঘি খাবে বাড়িতে। সুস্থ হলে আসবে। ” নাথা সিং অবাক! উনি মনে মনে ভাবলেন, আমি অসুস্থ কই, পুরো সুস্থ! সে-কথা আমতাআমতা করে বললেন, “না স্যর, আমি তো অসুস্থ নই। পুরো সুস্থ।” বিধানচন্দ্র রায় বললেন, “না, তুমি খুব অসুস্থ। পারলে আজকেই চলে যাও। এসে আমার এখানেই কাজে যোগ দেবে। তোমার ব্যাপারটা আমি দেখব।”

নাথা সিং বিস্ত সেদিন ট্রেন ধরে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। ঋষীকেশে নেমে হাঁটা দিলেন মণ্ডলের উদ্দেশে। পথে অনেক সঙ্গীসাথী জুটেও গেল । তাঁরাও চলেছেন বাড়ি। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই নাথা সিংয়ের পা আর চলে না। প্রচণ্ড অসুস্থতা অনুভব হচ্ছে। বাড়ি পৌঁছে একেবারে শয্যাশায়ী। সেই যে বিছানা নিয়েছিলেন তারপর পুরো সুস্থ হতে মাস চারেক লাগে। কলকাতা এসে আবার কাজে যোগ দিতে লাগে ছ’মাস। কথামতো বিধানচন্দ্র রায়ের কাছেই কাজে যোগ দেন। বিধানচন্দ্র রায় তাঁকে হাসতে বলেছিলেন, “কি, নাথা সিং এখন ঠিক আছ তো?” নাথা সিং বলেন, “হ্যাঁ, স্যর। কিন্তু আমি অসুস্থ কি করে বুঝেছিলেন স্যর!” তখন বিধানচন্দ্র রায় বলেছিলেন, “তুমি তো পাহাড়ি গ্রামের লোক। সেখানে খাঁটি ঘি, দুধ, টাটকা শাক-সবজি খেয়ে বড় হয়েছ। এখানকার খাবারগুলো তোমার শরীরে নিচ্ছিল না। সেইজন্য তোমাকে বলেছিলাম, বাড়ি গিয়ে ঘি, দুধ খাবে বেশি করে।”

নাথা সিং বিস্ত কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিলেন। তখনও ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের প্রতি কি কৃতজ্ঞতা। তাঁর কথা বলতে বলতে যেমন চোখ দিয়ে ঝল ঝরছিল তেমনই চোখ দুটো চকচক করত কৃতজ্ঞতায়। বলতেন, “স্যর, না-থাকলে আমি মারাই যেতাম। উনিই আমায় দিয়েছিলেন নবজন্ম। উনি পিতার মত।”

এই নাথা সিং পুলিশের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর নিজের গ্রামে ফিরেছিলেন। গ্রামে ফিরে এক মস্ত কাজ করতেন। নিজের ট্যাঁকের অর্থ খরচ করে গাছ বসাতেন মণ্ডল এবং তার আশপাশে। অথচ তাঁর কোন বাগাড়ম্বর ছিল না। কাউকে কাউকে বলতেনও গাছ বসানোর কথা। আমি শুনেছিলাম স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে। তিনি নাকি লাখখানেক গাছ বসিয়েছিলেন। নাথা সিংয়ের এমন মাতব্বরি দেখেছিলাম মণ্ডলে। পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা শুনে জানতে চাইতেন কলকাতা এবং রাজ্যের খুঁটিনাটি খবর। বলতেন, “কলকাতা তো আমার দ্বিতীয় জন্মভূমি।” খবর পেয়েছি, প্রকৃতি, পরিবেশ-পাগল মানুষ নাথা সিং বিস্ত প্রয়াত হয়েছেন কয়েক বছর আগে। সঙ্গের ছবিটি মণ্ডল গ্রামের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *